প্রবল বাতাসে সমুদ্র উর্মিমালার ফেনা তোলা মাতামাতি। নির্জনতায় বিশুদ্ধভাবে প্রকৃতির গান শোনা আর শেষ বিকেলের সোনারোদের আলোর রঙে আঁকা জলছবি। এর সব কিছু মিলবে এখানে।
টেকনাফের কাছে বাহারছড়া ইউনিয়নের পাশের শামলাপুর সমুদ্র সৈকত ঘুরে এসে সেই কথাই জানাচ্ছেন পরিব্রাজক ও চিত্রগ্রাহক ফারুখ আহমেদ। মাছধরার নৌকা আর জেলেরা ছাড়া সেই ভাবে কোনো মানুষজন চোখে পড়বে না, ঝাউবনে পাওয়া যাবে সবুজ ছোঁয়া। এসব দেখতে চলুন ঘুরে আসি।
কেউ কেউ তাকে বাহার ছড়া সমুদ্র সৈকত নামেও ডেকে থাকে। এখানকার দৃষ্টি নন্দন ঝাউবনে ঘেরা অপরূপে শোভিত নির্জন সৈকতে এসে ভালো লাগার ১৬ আনাই পাবেন! গরমকাল সেই কবে শেষ হয়েছে, শরতকালও প্রায় শেষ। এখন সময়গুলো মোটেও গরমের নয়। বেশ আরামদায়ক আবহাওয়া, ক্ষণে ক্ষণে রোদ ক্ষণে ক্ষণে বৃষ্টি। আকাশে রোদমেঘেদের খেলা। এমন বৃষ্টিভেজা মেঘলা আকাশের অপরূপ একদিন বের হলাম।
যাত্রা শুরু হল হোয়াইক্যং রোড থেকে, গন্তব্য শামলাপুর। হোয়াইক্যং রোড বা শামলাপুর নাম হয়ত অনেকেই শুনে থাকবেন। আবার কারও কারও মনে হবে জীবনে প্রথম শুনলাম এই নামগুলো। সে যাই হোক, টেকনাফ থেকে হোয়াইক্যং রোড ধরে ২০ কিলোমিটার দূরত্বের শামলাপুর গেলে যে সৌন্দর্য উন্মোচিত হবে তা সারা জীবন মনে থাকবে। টেকনাফ বহুবার গেছি। তবে টেকনাফ উদ্দেশ্য করে গেছি খুব কম সময়। এবারের ঘোরাফেরার মূল উদ্দেশ্যই ছিল টেকনাফের জালিয়ার দ্বীপ ও নাফনদীর উপর ডকুমেন্টারি করা।
খুব ভোরে বাস থেকে সাংবাদিক বোরহানুল হক সম্রাটসহ আমরা টেকনাফ লিঙ্ক রোডে নেমে সোজা চলে আসি জালিয়ার দ্বীপ। নাফনদীর তীরের ছোট্ট দ্বীপ জালিয়া অসাধারণ। আমরা জালিয়ার দ্বীপ ভ্রমণ বা এখানে আমাদের ডকুমেন্টারির কাজ শেষ করে দুপুরে চলে আসি হোয়াইক্যং রোডে স্থানীয় সাংবাদিক আবসার কবির আকাশের বাড়ি। রাস্তার ঠিক পাশে আবসার কবিরের সে বাড়ি থেকে নাফনদী ও পাহাড় দর্শন আর তা আপ্যায়ন অনেকদিন মনে থাকবে।
আপ্যায়ন পর্ব শেষে দুপরের ভাত ঘুমের সময়টা আমরা আকাশের বাড়িতে কাটিয়ে ঠিক সাড়ে তিনটার সময় শামলাপুরের উদ্দেশ্যে ব্যাটারি চালিত অটো রিকশায় চেপে বসি। আগেই বলেছি শামলাপুর থেকে সমুদ্র সৈকত দেখা যায়। আজ আমরা সমুদ্রের উর্মিমালায় মন হারাবো।
হোয়াইক্যং রোড ধরে কিছুটা পথ এগিয়ে ধমধমিয়ার পথে চলা শুরু করি, পাহাড়ি পথ। দুপাশের পুরোটাই ঘনজঙ্গল। জঙ্গলের রাস্তা দিয়ে এগিয়ে চলেছি আমরা। পথ চলতে চলতে চোখে পড়ে রাস্তা জুড়ে বাচ্চাদের খেলাধুলা আর কাঠ কুড়ানোর দৃশ্য। জঙ্গলের রাস্তা দিয়ে হেঁটে চলা কিছু ট্রেকারদেরও দেখা পেয়ে যাই। পুরো পথটাই যেন সবুজে মোড়া। অনেক নাম না জানা ফুলের সঙ্গে নীল বনলতা চোখে পড়ে।
এভাবেই জাদিমুরা, লেদা, মুচনি, রঙ্গীখালি ও মৌলবী পাড়া পেছনে ফেলে লাতুরিখোলায় এসে যাত্রা বিরতি নেই। লাতুরিখোলার আশপাশে পাহাড় ছাড়া আর কিছু নাই। এখানে জীবন অনেক ধীর। কোনো ব্যস্ততা নেই এখানকার মানুষের জীবন যাত্রার মধ্যে। বেশির ভাগই চাকমা নৃ-গোষ্ঠীর বসবাস। গ্রামবাসিদের উপার্জন কী? জানা যায়নি বা জানতে চাইনি।
যেহেতু এখানকার প্রকৃতি অসাধারণ সেহেতু ট্রেকারদের জন্য এমন প্রকৃতিতে চলাচল দারুণ বলা চলে। ভাবতে গিয়ে মনে হয় যদি স্থানীয়রা এখানে ভারতসহ বিভিণ্ন দেশের মতো হোমস্টের ব্যবস্থা করতো তাহলে বিষয়টা হত সোনায় সোহাগা। ইতিমধ্যে আমাদের সঙ্গী শিক্ষক জুলকারনাইন এর ছাত্রদের আপ্যায়ন ডাব চলে এসছে। আমরা ডাবের পানি পান করে দ্রুত সামনে যাই আর ভাবি প্রকৃতির মতোই সুন্দর আর ছবির মতো এখানকার মানুষগুলো। এভাবে কতক্ষণ চলেছি মনে নেই, দূর থেকে ঝাউগাছের সারি দেখে বুঝতে পারি সমুদ্র খুব কাছাকাছি। এরপরের সময়টুকু মেরিন ড্রাইভ রোডের।
তারপরই পা রাখি শামলাপুর সমুদ্র সৈকতে। গত ফেব্রুয়ারিতে শামলাপুর সৈকতে মাস ব্যাপি ঝাউবন কাটার খবর দেশের সবকটা জাতীয় দৈনিকের হেড লাইন হয়েছিল! ঝাউগাছের সারি, বালুর নরম বিছানা, তার সামনে বিশ্রামরত মাছ ধরার ট্রলার। আরও সামনে অপরূপ বঙ্গপোসাগর। এখানে নির্জনতাও একটা বড় ব্যাপার। কক্সবাজার হিমছড়ি বা ইনানীতে কত মানুষের ভীড়। আর হৈহুল্লোড়। এখানে তার কিছুই নেই।
বেলা পড়ে আসায় মাছ ধরার ট্রলারগুলো টেনে তীরে তোলা হচ্ছে। অনেকেই জাল দিয়ে মাছ ধরছে। একঝাঁক স্থানীয় শিশুর চিৎকার আর দৌড়ঝাঁপের মধ্যে চোখে পড়লো শুধুই সমুদ্র আর তার নীল জলরাশির শোঁ শোঁ গর্জন। আবেগ কোত্থেকে উথলে উঠলো বলতে পারবো না। সারা শরীরে কারেন্টের মতো শিহরন বয়ে গেলো। পানি আমার খুব পছন্দ, তাই তো বারবার নদীর কাছে ছুটে যাই, ছুটে আসি সমুদ্রের কাছে। সমুদ্র বা নদী কেউ আমাকে নিরাশ করে না বা করেনি। তাইতো আজ এখানে বা সমুদ্র সৈকতে পা দিয়েই দারুণ রোমান্স অনুভব করি।
এরমধ্যে স্থানীয় স্কুলের শিক্ষক খোকন স্যার আমাকে নিয়ে চলেন লাল কাঁকড়া দেখাতে। আমাদের সঙ্গে যোগ দেন জুলকারনাইন। অন্যদিকে বোরহানুল হক সম্রাট দলবল নিয়ে সমুদ্র জলে অবগাহনে মেতেছেন। সব মিলে শামলাপুর এসে সমুদ্র সৈকতের রোমান্সের সঙ্গে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য যে চমৎকার মিশেল পাওয়া গেলো তা এক কথায় অসাধারণ। এমন অসাধারণে বারবার আমি ডুবতে চাই, কারণ আমার কাছে মনে হয় সৈকত শুধুই জীবনের উৎসব।
দরকারি তথ্য: কক্সবাজার থেকে মেরিন ড্রাইভ সড়ক ধরে সোজা ঘণ্টা দুয়েক গেলেই শামলাপুর বা বাহারছড়া সমুদ্র সৈকতের দেখা মিলবে। আমরা গিয়েছিলাম টেকনাফ থেকে। অ্যাডভেঞ্চার প্রিয়দের জন্য আমাদের পথে যাওয়া, মানে হোয়াইক্যং রোড ধরে শামলাপুর পর্যন্ত পথটুকু দারুণ উপভোগ্য হবে নিঃসন্দেহে।
সে জন্য আপনাদের টেকনাফের বাসে চড়ে টেকনাফ সড়কের হোয়াইক্যং রোড নামতে হবে। তারপর ধমধমিয়া হয়ে চলে আসুন শামলাপুর সমুদ্র সৈকত। সিএনজি চালিত অটো রিক্সা বা ব্যাটারি চালিত অটো বাহনই হোয়াইক্যং রোড থেকে শামলাপুর পর্যন্ত একমাত্র ভরসা। শামলাপুর থাকা খাওয়ার কোনো ব্যবস্থা নেই। কক্সবাজার বা ইনানি একমাত্র ভরসা। তবে চলতি পথে ছোটখাটো কিছু বাজার ও দোকানের দেখা পাবেন। সেখানেই সারতে পারবেন প্রযোজনীয় কাজ।
একটা বিষয় খেয়াল রাখবেন আপনার বা আপনার ভ্রমণ সঙ্গীদের কারণে পরিবেশ হুমকিতে পড়ে এমন কোনো কিছু অবশ্যই করা চলবে না। পলিথিন বা প্লাস্টিকের বোতলসহ পরিবেশ বিপন্ন হয় তেমন কিছু ফেলে আসবেন না সমুদ্র সৈকতে!
শামলাপুর সমুদ্র সৈকতে
Reviewed by Nahidul Islam
on
May 19, 2017
Rating:
Reviewed by Nahidul Islam
on
May 19, 2017
Rating:

